কাজী নজরুল ইসলামের মতো কবি ও দার্শনিকরা দীর্ঘকাল প্রেমের প্রকৃতি বোঝার চেষ্টা করেছেন। কেউ কেউ প্রেমকে একটি গুণ হিসেবে দেখেছেন যে গুণ নৈতিক বিকাশ এবং ব্যক্তিগত উন্নয়নে উৎসাহিত করে। অন্যরা এটিকে একটি মৌলিক শক্তি হিসেবে গণ্য করেছেন যে শক্তি ব্যক্তি ও সম্প্রদায়কে সংযুক্ত করে।
প্রেম শব্দটি সাংস্কৃতিক। ‘প্রেম’ শব্দের প্রকৃতি ও প্রত্যয় হলো: প্রিয় + ইমন (ইমন্) = প্রেম। ইমন তদ্ধিত প্রত্যয়। সংস্কৃত ব্যাকরণের নিয়মানুযায়ী, ‘প্রিয়’ শব্দের সাথে ‘ইমন’ প্রত্যয় যুক্ত হলে ‘প্রিয়’ শব্দটির স্থলে ‘প্র’ হয় এবং আদি স্বরের গুণ হয়ে ‘প্রেম’ শব্দটি গঠিত হয়। সংগীতের ভাষায় ‘ইমন’ একটি রাগ। এটি প্রেমের রাগ। একে কল্যাণ নামেও ডাকা হয়। বস্তুত ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের অন্যতম জনপ্রিয়, সুমধুর ও ব্যাপক ব্যবহৃত ও প্রচলিত রাগ এটি। উচ্চাঙ্গ সংগীত শেখার শুরুতে সাধারণত এই রাগ দিয়েই শিক্ষার্থীদের গায়কি বা বাদ্য-বাজনার হাতেখড়ি হয়। এটি মূলত শান্ত, স্নিগ্ধ এবং গম্ভীর প্রকৃতির রাগ। প্রেমের ক্ষেত্রে এই গাম্ভীর্য মূলত প্রেমের পথ সহজ নয়, এমন একটি ধারণাকে প্রোথিত করে। এই রাগে সব স্বর শুদ্ধ, কেবল মধ্যম স্বরটি তীব্র। এই হিসেবে একসময় প্রেম শুদ্ধই ছিল, কিন্তু এখন তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত। এই রাগের জাতি আরোহ-অবরোহ উভয় ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ। অর্থাৎ আরোহ ও অবরোহ উভয় ক্ষেত্রেই সাতটি স্বরই অবিকৃত রূপে ব্যবহৃত হয়। প্রেমের ক্ষেত্রেও কোনো কিছু অপূর্ণ থাকলে পরিপূর্ণ সুখী হওয়া যায় না। এই রাগের গীত সময়– রাত্রির প্রথম প্রহর (সন্ধ্যা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত গাওয়ার উপযুক্ত সময়)। এর প্রধান রস-শান্ত, ভক্তি এবং শৃঙ্গার (প্রেম) রস। শান্ত-নম্র-ভদ্র স্বভাব এবং প্রেমাস্পদের প্রতি নির্ভেজাল ভক্তিই প্রেমের রসে রূপান্তরিত। ইমন রাগের সাথে স্রষ্টাভক্তির যেমন অনাবিল সম্পর্ক রয়েছে, তেমনি রয়েছে মানব-মানবীর প্রেমও। এই রাগের তীব্র মধ্যম প্রেমে জাদুর ছোঁয়ার মতো কাজ করে। ভারতীয় উপমহাদেশের বা বাংলা সিনেমার বেশির ভাগ রোমান্টিক বা ভক্তিভীতিমূলক জনপ্রিয় গান রাগ ইমনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। সন্ধ্যা নামার মুখে এই রাগের আলাপ বা বিস্তার মনের ভেতর এক অদ্ভুত প্রশান্তি এনে দেয়। ভালোবাসা প্রকাশে প্রেম শব্দটি অত্যন্ত কার্যকর।
সম্পাদক: শারমিন চৌধুরী, প্রকাশক: সুলতান ইয়াছিন আরাফাত।
Copyright © 2026 বাংলার সময়. All rights reserved.